ঢাকা ০৫:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo লাখো ভক্তের সমাগমে আটরশিতে শুরু বিশ্ব উরস শরীফ Logo রাজবাড়ীতে যুবসমাজ ও প্রবাসীদের উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ Logo রাজবাড়ীতে রাফি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ৬০জন শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ Logo বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত Logo ঘন কুয়াশায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ১২ ঘণ্টা ফেরি বন্ধ, চরম ভোগান্তিতে যাত্রী ও চালকরা Logo রাজবাড়ীতে প্রবাসীর বাড়িতে হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি Logo সত্য ও সাহসী সাংবাদিকতার ৭৩ বছর: রাজবাড়ীতে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী Logo আহলাদীপুর হাইওয়ে থানার উদ্যোগে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন Logo রাজবাড়ীতে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে সওজ বিভাগের শ্রদ্ধা নিবেদন Logo শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে রাজবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের গভীর শ্রদ্ধা
শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও স্বাবলম্বী

হুইল চেয়ারে বসেই জীবনের লড়াই চালাচ্ছেন রাজবাড়ীর শাওন শেখ

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৮:০৭:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
  • ৫০ বার পড়া হয়েছে

ভিক্ষা নয়, নিজের পরিশ্রমেই জীবনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন রাজবাড়ীর শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক শাওন শেখ (২০)। হুইল চেয়ারে ভর করে শহরের স্কুলগেটের সামনে চালাচ্ছেন ছোট্ট দোকান। সেই আয়েই নিজ ও মায়ের ওষুধ আর পরিবারের খরচ মেটাচ্ছেন।

প্রতিবন্ধী শাওন শেখ রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের মাটিপাড়া গ্রামের ভূমিহীন রিকশাচালক শফিক শেখের মেজ ছেলে। বর্তমানে রাজবাড়ী পৌরসভাধীন জেলখানা সংলগ্ন এলাকায় একটি বাড়ীতে ভাতা থাকেন।

জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল ৯টায় শহরের শহীদ স্মৃতি স্টেডিয়াম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর সামনে হুইলচেয়ারে বসে হুইল চেয়ারকেই দোকানে পরিণত করে ব্যবসা করছেন শাওন শেখ। দোকানের আয় দিয়ে তিনি মায়ের ওষুধ এবং ভাইয়ের খাবার জোগাচ্ছেন। এক সময় রাজবাড়ী সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর ছাত্র ছিলেন শাওন; কিন্তু ২০২১ সালে এক অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে দুই পায়ের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও সুস্থ হতে না পারায় ২০২৪ সালে হুইলচেয়ারে বসেই তিনি নতুন জীবন শুরু করেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দুই পা অচল, তবু জীবন থামেনি রাজবাড়ীর শাওন শেখের। সকাল হলেই মা-বাবার সাহায্যে হুইল চেয়ারে চড়ে বের হন তিনি। রাজবাড়ী শহরের শহীদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে প্রতিদিন সকাল নয়টায় দোকান বসান শাওন। বিক্রি করেন চিপস, চানাচুর, আচারসহ নানা খাবার। স্কুলের শিক্ষার্থী ও পথচারীরাই তার নিয়মিত ক্রেতা। হাসিমুখে বিক্রি করেন, গুনে নেন দিনের উপার্জন। বিক্রির টাকায় কেনেন নিজ ও মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের খাবার।

ক্রেতা শিক্ষার্থীর অভিভাবক অনন্যা দত্ত ক্রেতা বলেন, “আমি প্রতিদিন এখানে আসি শাওন ভাইয়ের দোকান থেকে একটু কিছু কিনি। ওর হুইল চেয়ারে বসে দোকান চালানোর দৃশ্য দেখে মনটা জাগে। ভিক্ষা নয়, নিজ পরিশ্রমে জীবনের লড়াইটা চালাচ্ছে। ওর হাসি‑চোখ থেকে বোঝা যায়, নতুন এক আশা নিয়ে এগোচ্ছে সে।”

শহীদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিনয় কুমার বিশ্বাস বলেন, শাওন আমাদের বিদ্যালয়ের পাশে দোকান করে। মানবিক কারণে আমরা তাকে করতে দিই। শাওন সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কেউ তাকে ভিক্ষা করতে দেখেননি, বরং নিজ পরিশ্রমেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।

শাওনের মা সাহানা বেগম চোখের পানি লুকাতে লুকাতে বলেন,“আমাদের কোনো জমি‑জমা নেই। ভাড়া বাসায় থাকি। আমার ছেলে হুইল চেয়ারে বসে দোকান চালায়, নিজের পরিশ্রমে সংসার টানে। ওর কষ্ট দেখে বুকটা ফেটে যায়। আমার একটাই চাওয়া সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হোক। ও তো ভিক্ষা চায় না, শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়।” “সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ আমার ছেলের দিকে একটু নজর দিন।”

শাওনের বাবা রিক্সা চালক মো: শফিক শেখ বলেন, ফরিদপুর হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু কিছু ধরতে পারেনি। ঢাকায় নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু টাকার অভাবে পারিনি। শাওনের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য বিত্তবানদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। সে হুইল চেয়ারে বসে দোকান চালায়, তবু চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছে না। দিন দিন ওর অসুস্থতা বাড়ছে এখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।”

রাজবাড়ীর সমাজসেবা অধিদপ্তরর উপ‑পরিচালক রুবাইয়াত ফেরদৌস বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, দীর্ঘদিন শাওন প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে না। সে যদি সংশ্লিষ্ট উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করে, তাহলে আমরা অবশ্যই তাকে সার্বিক সহযোগিতা করবো এবং খতিয়ে দেখব কেন তার ভাতাটি বন্ধ রয়েছে।”

রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারিয়া হক বলেন, “শাওন আমাদের সমাজের এক অনুপ্রেরণার উৎস। নিজের পরিশ্রমে স্বাবলম্বী হয়েছে এটি সত্যিই গৌরবের। শুনেছি, ওর পরিবার ভূমিহীন এবং ভাড়া বাসায় থাকছে। উপজেলা প্রশাসন তার ও তার মায়ের চিকিৎসার খরচ এবং কৃষি জমি বন্দোবস্তের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমি চাই সমাজের ভালো মানুষরাও একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিন।”

ট্যাগস :

লাখো ভক্তের সমাগমে আটরশিতে শুরু বিশ্ব উরস শরীফ

শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও স্বাবলম্বী

হুইল চেয়ারে বসেই জীবনের লড়াই চালাচ্ছেন রাজবাড়ীর শাওন শেখ

আপডেট সময় ০৮:০৭:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫

ভিক্ষা নয়, নিজের পরিশ্রমেই জীবনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন রাজবাড়ীর শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক শাওন শেখ (২০)। হুইল চেয়ারে ভর করে শহরের স্কুলগেটের সামনে চালাচ্ছেন ছোট্ট দোকান। সেই আয়েই নিজ ও মায়ের ওষুধ আর পরিবারের খরচ মেটাচ্ছেন।

প্রতিবন্ধী শাওন শেখ রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের মাটিপাড়া গ্রামের ভূমিহীন রিকশাচালক শফিক শেখের মেজ ছেলে। বর্তমানে রাজবাড়ী পৌরসভাধীন জেলখানা সংলগ্ন এলাকায় একটি বাড়ীতে ভাতা থাকেন।

জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল ৯টায় শহরের শহীদ স্মৃতি স্টেডিয়াম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর সামনে হুইলচেয়ারে বসে হুইল চেয়ারকেই দোকানে পরিণত করে ব্যবসা করছেন শাওন শেখ। দোকানের আয় দিয়ে তিনি মায়ের ওষুধ এবং ভাইয়ের খাবার জোগাচ্ছেন। এক সময় রাজবাড়ী সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর ছাত্র ছিলেন শাওন; কিন্তু ২০২১ সালে এক অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে দুই পায়ের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও সুস্থ হতে না পারায় ২০২৪ সালে হুইলচেয়ারে বসেই তিনি নতুন জীবন শুরু করেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দুই পা অচল, তবু জীবন থামেনি রাজবাড়ীর শাওন শেখের। সকাল হলেই মা-বাবার সাহায্যে হুইল চেয়ারে চড়ে বের হন তিনি। রাজবাড়ী শহরের শহীদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে প্রতিদিন সকাল নয়টায় দোকান বসান শাওন। বিক্রি করেন চিপস, চানাচুর, আচারসহ নানা খাবার। স্কুলের শিক্ষার্থী ও পথচারীরাই তার নিয়মিত ক্রেতা। হাসিমুখে বিক্রি করেন, গুনে নেন দিনের উপার্জন। বিক্রির টাকায় কেনেন নিজ ও মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের খাবার।

ক্রেতা শিক্ষার্থীর অভিভাবক অনন্যা দত্ত ক্রেতা বলেন, “আমি প্রতিদিন এখানে আসি শাওন ভাইয়ের দোকান থেকে একটু কিছু কিনি। ওর হুইল চেয়ারে বসে দোকান চালানোর দৃশ্য দেখে মনটা জাগে। ভিক্ষা নয়, নিজ পরিশ্রমে জীবনের লড়াইটা চালাচ্ছে। ওর হাসি‑চোখ থেকে বোঝা যায়, নতুন এক আশা নিয়ে এগোচ্ছে সে।”

শহীদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিনয় কুমার বিশ্বাস বলেন, শাওন আমাদের বিদ্যালয়ের পাশে দোকান করে। মানবিক কারণে আমরা তাকে করতে দিই। শাওন সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কেউ তাকে ভিক্ষা করতে দেখেননি, বরং নিজ পরিশ্রমেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।

শাওনের মা সাহানা বেগম চোখের পানি লুকাতে লুকাতে বলেন,“আমাদের কোনো জমি‑জমা নেই। ভাড়া বাসায় থাকি। আমার ছেলে হুইল চেয়ারে বসে দোকান চালায়, নিজের পরিশ্রমে সংসার টানে। ওর কষ্ট দেখে বুকটা ফেটে যায়। আমার একটাই চাওয়া সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হোক। ও তো ভিক্ষা চায় না, শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়।” “সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ আমার ছেলের দিকে একটু নজর দিন।”

শাওনের বাবা রিক্সা চালক মো: শফিক শেখ বলেন, ফরিদপুর হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু কিছু ধরতে পারেনি। ঢাকায় নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু টাকার অভাবে পারিনি। শাওনের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য বিত্তবানদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। সে হুইল চেয়ারে বসে দোকান চালায়, তবু চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছে না। দিন দিন ওর অসুস্থতা বাড়ছে এখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।”

রাজবাড়ীর সমাজসেবা অধিদপ্তরর উপ‑পরিচালক রুবাইয়াত ফেরদৌস বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, দীর্ঘদিন শাওন প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে না। সে যদি সংশ্লিষ্ট উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করে, তাহলে আমরা অবশ্যই তাকে সার্বিক সহযোগিতা করবো এবং খতিয়ে দেখব কেন তার ভাতাটি বন্ধ রয়েছে।”

রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারিয়া হক বলেন, “শাওন আমাদের সমাজের এক অনুপ্রেরণার উৎস। নিজের পরিশ্রমে স্বাবলম্বী হয়েছে এটি সত্যিই গৌরবের। শুনেছি, ওর পরিবার ভূমিহীন এবং ভাড়া বাসায় থাকছে। উপজেলা প্রশাসন তার ও তার মায়ের চিকিৎসার খরচ এবং কৃষি জমি বন্দোবস্তের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমি চাই সমাজের ভালো মানুষরাও একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিন।”